
গাজীপুর প্রতিনিধি: মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে গাজীপুরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত করা এবং রণাঙ্গণে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শহীদুল ইসলাম পাঠান, যিনি ‘জিন্নাহ পাঠান’ নামে অধিক পরিচিত, স্থানীয়ভাবে এক সাহসী সংগঠক ও দুঃসাহসিক কমান্ডার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
পূর্ব জয়দেবপুর (বরুদা), গাজীপুরে জন্মগ্রহণকারী এই সংগ্রামী নেতা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে তৎকালীন ঢাকা সদর উত্তর মহকুমায় নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯-৭০ সেশনে ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে জিন্নাহ পাঠানসহ কয়েকজন নেতা গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে গোপনে অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। জোড়পুকুর পাড় পাইলট স্কুল মাঠ ও ভুরুলিয়ার গজারী গড় এলাকায় তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৯ মার্চ গঠিত ১১ সদস্যের “মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ”-এর সদস্য হিসেবে তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধে সরাসরি অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে আসামের লায়লাপুরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সাধারণ ও লিডারশিপ—দুই ধাপেই ২১ দিন করে প্রশিক্ষণ শেষে সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে তাঁকে কমান্ডশিপ প্রদান করা হয়। স্থানীয় কমান্ডার হিসেবে তিনি একাধিক সফল অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
৫ ডিসেম্বর জয়দেবপুর রেলস্টেশনে পাকবাহিনীর ওপর আকস্মিক হামলায় ১৫ জন শত্রুসেনা নিহত ও বহু আহত হয় বলে সহযোদ্ধাদের ভাষ্য। নভেম্বরের শেষ দিকে রাজেন্দ্রপুর ডিপো থেকে অস্ত্রবাহী মালগাড়ি ধ্বংস করে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। ১২ ডিসেম্বর রাজবাড়ী ক্যান্টনমেন্টে দুঃসাহসিক আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান ধরে রাখলেও পরবর্তীতে পাকবাহিনীর রিইনফোর্সমেন্ট এলে তারা নিরাপদে সরে যান। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ছয়দানা এলাকায় পাকবাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার সময় ট্যাংক ও গোলাবারুদবাহী যান ধ্বংসের ঘটনাও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর জয়দেবপুর থানার প্রথম ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখেন এবং দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। গাজীপুর জেলায় শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক (১৯৮৫) ও শ্রেষ্ঠ মঞ্চ পরিচালক (১৯৮৭) হিসেবে পুরস্কৃত হন।
২০০৬ সালের ২৬ জুন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তেকাল করেন। গাজীপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জিন্নাহ পাঠান নামটি আজও প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের সাহসী সংগঠক ও রণাঙ্গনের নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে আছে।





















আপনার মতামত লিখুন :